পয়লা বৈশাখ ও মৃৎশিল্প
সফিউল্লাহ আনসারী
বাংলা নববর্ষ।পয়লা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক অনন্য উৎসব। নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন। এই আনন্দ উৎসবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মৃৎশিল্প।
মাটির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক চিরন্তন। এই মাটিই আমাদের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির ভিত্তি। সেই মাটির স্পর্শে গড়ে ওঠা মৃৎশিল্প শুধু ব্যবহারিক সামগ্রী নয়, বরং তা আমাদের ঐতিহ্যের নিদর্শন। পয়লা বৈশাখকে ঘিরে গ্রামবাংলার হাট বাজারে দেখা যায় মাটির তৈরি নানান পণ্য হাঁড়ি-পাতিল, কলস, খেলনা, নকশা করা শোপিস। এগুলো শুধু প্রয়োজন মেটায় না, বরং ঘরে আনে উৎসবের ছোঁয়া ও সৌন্দর্য। মৃৎ শিল্পের এই পণ্য একসময় বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে ছিলো নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র।
পয়লা বৈশাখের মেলায় মৃৎশিল্পীদের উপস্থিতি এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। রঙিন মাটির পুতুল, ঘোড়া, হাতি কিংবা পাখির অবয়ব শিশুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এসব শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও সৌন্দর্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকতার চাপে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। প্লাস্টিক ও যান্ত্রিক পণ্যের ভীড়ে মাটির তৈরি জিনিসগুলো ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। এই শিল্পকে রক্ষায় প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা ও ভালোবাসা। পয়লা বৈশাখের আনন্দে আমরা যদি মৃৎশিল্পকে স্থান দিই, তবে তা শুধু একটি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং আমাদের শিকড়কে আঁকড়ে ধরার এক দৃঢ় প্রয়াস হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি, যাতে তারা নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি গর্ববোধ করে। পাশাপাশি অসংখ্য পরিবার এই শিল্পের সাথে জড়িত। তাদের কথা চিন্তা করে হলেও মৃৎশিল্প বাঁচাতে এগিয়ে আসা উচিত।
পয়লা বৈশাখ আমাদের শিখায় নতুন করে শুরু করতে, পুরোনোকে ভালোবেসে এগিয়ে যেতে। মৃৎশিল্পও তেমনি মাটির গন্ধে ভর করে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কথা বলে। আসুন, এই নববর্ষে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, মাটির শিল্পকে ভালোবাসবো, সংরক্ষণ করবো এবং আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবো এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
শুভ নববর্ষ সবাইকে।


















